পিত্তথলিতে পাথর?

পিত্তথলিতে পাথর?

পিত্তথলিতে পাথর হওয়া খুবই পরিচিত একটি সমস্যা। চারপাশের অনেকেরই কাছ থেকে এই অভিজ্ঞতা শোনা যায়। এই পাথর কি সত্যি সত্যি পথের কুড়িয়ে পাওয়া নুড়ি পাথরের মতো, নাকি অন্য কিছু? আর কীভাবেই বা সন্দেহ হবে যে পিত্তথলিতে পাথর হতে পারে আপনার?

পাথর আসলে কী?
পিত্তথলির পাথর আসলে ছোট ছোট বালুর দানার মতো থেকে শুরু করে মটরের দানা বা তার চেয়েও বড় শক্ত দানাদার বস্তু, যা বিভিন্ন রঙের ও বিভিন্ন আকৃতির হতে পারে। এটা নির্ভর করে কী পদার্থ দিয়ে পাথরটা তৈরি তার ওপর। কোলেস্টেরল, বিলিরুবিন বা ক্যালসিয়াম ইত্যাদি পদার্থের সংমিশ্রণে তৈরি এই পাথরগুলো পিত্তরসের সঙ্গে মেশানো অবস্থায় থাকে এবং হালকা বাদামি, ময়লাটে সাদা বা কুচকুচে কালো রঙেরও হতে পারে। পেটের ডানদিকে যকৃতের পেছনে ও তলার দিকে থাকে পিত্তথলি। পিত্তরস তৈরি করাই এর কাজ। খাবার হজমে, বিশেষ করে চর্বিজাতীয় খাবার হজম করতে পিত্তরস দরকার হয়। নানা কারণে এই পিত্তথলিতে বিভিন্ন পদার্থ অতিরিক্ত জমে গিয়ে পাথরের সৃষ্টি করে।

কাদের হয় বেশি?
স্থূল ও ওজনাধিক্য ব্যক্তিদের পিত্তথলিতে পাথর বেশি হতে দেখা যায়। পুরুষদের তুলনায় নারীদের এই প্রবণতা বেশি। এ ছাড়া চল্লিশোর্ধ্ব বয়স, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি খাবার অভ্যাস, অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাদ্য গ্রহণ ইত্যাদি এই ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

কীভাবে বুঝবেন?
পিত্তথলির অবস্থানটা পেটের কোথায় তা আগেই বলা হয়েছে। পিত্তথলিতে পাথর হলে এতে প্রদাহ হয়, যাকে কোলেসিস্টাইটিস বলা হয়। তখন ওপর পেটের ডানদিকে তীব্র ব্যথা হতে পারে। মিনিট খানেক হতে ঘণ্টা খানেক স্থায়ী হতে পারে এই ব্যথা। পেটের পেছন দিকে, কাঁধে, পেটের মাঝ বরাবর এমনকি বুকের ভেতরও ছড়িয়ে পড়তে পারে ধীরে ধীরে। সেই সঙ্গে বমি ভাব বা বমি, হালকা জ্বর ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। অনেক সময় পাথর পিত্তথলি থেকে বোরোতে গিয়ে পিত্তনালিতে আটকে যায় এবং তখন বিলিরুবিনের বিপাক ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার দরুন জন্ডিসও হতে পারে। রোগ নির্ণয়ের জন্য এই উপসর্গের পাশাপাশি পেটের আলট্রাসনোগ্রামই যথেষ্ট। পাথরের অবস্থান জানতে বা প্রয়োজনে বের করতে ইআরসিপি জাতীয় পরীক্ষা করা যেতে পারে। তবে পেটের আলসার, যকৃতের কোনো সমস্যা বা এমনকি হূদেরাগেও কাছাকাছি ধরনের ব্যথা হতে পারে বলে সেগুলোর অবস্থাও নির্ণয় করে নেওয়া দরকার হয়।

প্রাকৃতিক উপায়ে কাটিয়ে উঠুন পিত্তথলির পাথরের সমস্যা

আমরা চাইলে প্রাকৃতিকভাবে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে পারি। আর তাই ঘরোয়া উপায়ে এই সমস্যা সমাধানের জন্য নিচের টিপস দেখতে পারেন।

  • বিটরুট গাজরের জুস (beetroot and carrot juice): পিত্তথলির পাথর প্রতিরোধে বিটরুট ও গাজরের জুসের তুলনা হয় না। বিটরুট গাছ থেকে বিটরুট ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করে জুস করুন, একইভাবে গাজর ও শশা থেকে জুস তৈরি করুন। এবার তিন রকম জুস সমপরিমাণ এক সাথে নিয়ে ভালোভাবে মিশান। দিনে দুইবার এই জুস খাওয়াতে আপনার সমস্যা দূর হবে।
  • আঁশযুক্ত খাবার (high fiber cereal): আপনার পিত্তথলির পাথরের সমস্যা দূর করতে উচ্চ ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া জরুরী। আপনি আপনার খাবার তালিকা থেকে চিনি ও চর্বি যুক্ত খাবারগুলো বেছে বেছে বাদ দিয়ে সেখানে আপনার সকালে খাদ্যের মধ্যে প্রতিদিন উচ্চ ফাইবার খাদ্য শস্য যোগ করুন. এটি আপনার পিত্তশয়ের সমস্ত রোগ প্রতিরোধের সাথে সাথে পিত্তথলির পাথরের রোগ প্রতিরোধ করবে।
  • হলুদ (turmeric): পিত্তথলির পাথর রোধ করতে হলুদ একটি কার্যকরী উপাদান। হলুদের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টিইনফ্লামেটরি উপাদান পিত্তথলির পাথর প্রতিরোধের একটি অন্যতম উপাদান। প্রতিদিন আধ টেবিল চামচ হলুদ গ্রহণ করাতে এ রোগের সম্ভাবনা ৮০% কমে যায়।
  • সবজি (Vegetables): প্রতিদিনেরখাবার তালিকায় উচ্চ ফাইবার সমৃদ্ধ সবজি যোগ করুন। আপনার অস্বাস্থ্যকর ফ্যাটযুক্ত খাবারের থেকে এটি যেমন আপনাকে সুস্থ আর ফিট রাখবে ঠিক একইভাবে আপনার পিত্তথলির পাথর প্রতিরোধ করবে।
  • প্রক্রিয়াজাতকৃত খাবার এড়িয়ে চলুন (avoid refined foods): এড়িয়ে চলুন বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাতকৃত ও কৃত্রিম ফ্লেভার-রংযুক্ত খাবার। যেমন, লাল মাংস, আইসক্রিম, সাদা ময়দাপণ্য, কৃত্রিম মিষ্টি জাত পণ্য।

 

চিকিৎসা কী?
প্রদাহ ও তীব্র ব্যথার সময় কোনো অস্ত্রোপচার করা হয় না। সাধারণত কয়েক দিনের জন্য মুখে খাদ্য গ্রহণ বন্ধ করে দিয়ে স্যালাইন, অ্যান্টিবায়োটিক ও ব্যথানাশক ওষুধ দিয়ে প্রাথমিক উপশমের চেষ্টা করা হয়। পরে পিত্তথলি ফেলে দেওয়ার অস্ত্রোপচারটি সপ্তাহ দুয়েক পর বা দু-তিন মাস পর করলেও ক্ষতি নেই। পেট কেটে বা ফুটো করে—দুভাবেই এই অস্ত্রোপচার করা যায়। তবে পিত্তনালিতে পাথর আটকে গিয়ে থাকলে ইআরসিপি যন্ত্রের সাহায্যে সেটি বের করে আনা হয়।

অনেক সময় পিত্তথলিতে পাথর হলেও রোগী কোনো প্রকার ব্যথা বা অন্য সমস্যা অনুভব করেনা। সাধারনত অন্য কোনো রোগের জন্য পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাম করতে গিয়ে এটা ধরা পরে। এসব ক্ষেত্রে অনেক চিকিৎসকই কলিসিস্টেকটমি না করে অপেক্ষা করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন এবং ব্যথা হলে তবেই অপারেশন করাতে বলেন। তবে এই নিয়ে বিতর্ক আছে কারন অনেক দিন পাথর থাকা অবস্থায় অপারেশন না করালে তা ক্যান্সারে রূপান্তরিত হতে পারে এসব বিষয়ও বিভিন্ন গবেষণায় পাওয়া গেছে। তাই সব দিক বিবেচনা করে পিত্তথলিতে পাথর হলে তা একজন অভিজ্ঞ সার্জন কর্তৃক ল্যাপকলির মাধ্যমে অপারেশন বা ল্যাপারোস্কপিক কলিসিস্টেকটমি করিয়ে নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

 

[ux_custom_products cat=”glucose-monitor” products=”6″ columns=”4″ title=”Check our bestsellers!”]

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *